গুম রহস্য ও বাংলা সিনেমার দুর্দিন

এপ্রিল ২৩, ২০১৪ ৪:১৭ পূর্বাহ্ণ

18861বাংলা চলচ্চিত্রের ঘোর দুর্দিন চলছে। এককালে জমজমাট সিনেমা হলগুলো এখন ফাঁকা। ঢাকা চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরের মানুষ আজ সিনেমা বিমুখ। হলগুলো হয় বন্ধ নয়তো লাটে উঠার দিন গুনছে। মরা নদীতে জোয়ার আনার জন্য মরিয়া অনন্ত জলিল নামের দু’এক জনকে পাওয়া গেলেও সিনেমা জমছে না। পাশের বঙ্গেও একই অবস্থা ছিল। কিন্তু তারা প্রায় সামলে উঠেছেন। আমি চলচ্চিত্রের মানুষ নই। তবে এককালের সিনেমা পোকা। টিকেট না পেয়ে ঈশ্বরের ওপর নাখোশ হওয়া বালক, প্রায়ই ভাবি আচ্ছা কী এমন হল যে মানুষ ছায়াছবি দেখা বন্ধ করে দিল? ইউটিউব বা কম্পিউটারের কারণে এমন অনীহা এটা ঠিক মানা যায় না। গুগলের রাজত্বে তো লাইব্রেরি বন্ধ হয়নি। মানুষের বই কেনা বন্ধ হয়নি। আমাদের বইমেলা তার উজ্জ্বল প্রমাণ। বায়স্কোপের  দুর্দিন রহস্য যেন হঠাৎ করেই উন্মোচিত হয়ে পড়ল আমার কাছে। সম্প্রতি সারাদেশে যে নাটক, প্রতিদিন ঘটে যাওয়া সাদাকালো ও রঙ্গীন সিনেমার চিত্রায়ন  মানুষ আসলে তাতেই মজে আছে। কোন দেশে কোন সমাজে এমন মাগনা সিনেমা দেখা যায় না! কী নাই আমাদের দৈনন্দিন বায়স্কোপে? রাজা-উজির-নাজির-মন্ত্রী-ভিলেন ক্লাউনে পরিপূর্ণ এক বিনোদন জগত। এরশাদের মত ক্লাউন মন্ত্রীদের মত ভাঁড় নেতাদের মত কমিক চরিত্রে জমজমাট সিনেমায় ভালোই দিন গুজরাণ জাতির। মাঝে মাঝে ক্লাইমেক্স  ও এন্টি ক্লাইমেক্স ওঠে চরমে।  অতি সম্প্রতি গুম  নামে যে রহস্য কাহিনী তাতে সিনেমা হলে যাবার আর কোন দরকার আছে বলে মনে হয়না।
কোন মানুষের হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। আমাদের এই নিরাপদ শহর সিডনিতেও তা হয়। বাসস্টপ ট্রেন স্টেশন বা পাবলিক প্লেস নামে পরিচিত জনবহুল জায়গায় পোস্টার ও সরকারি বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষ খোঁজার রেওয়াজ আছে। লস্ট নামে পরিচিত এসব মানুষের কেউ স্মৃতি ভ্রষ্ট, কেউ বা মানসিক ভারসাম্যহীন। কারো শরীর ভালো নয়। কারো বা আছে আইনি সমস্যা। এসব দেশ ও সমাজ আমাদের মত এককেন্দ্রিক নয়। বহু জাতিক সমাজে কেউ কাউকে চেনে না জানেও না। এমন মানুষও আছে যাদের তিনকূলে কেউ নেই। জার্মানি বা পোল্যান্ড থেকে আসা কারো হয়তো কোন আত্মীয় বা পরিচিত জনও নেই। ফলে সে হারিয়ে গেলে তাকে খোঁজার দায় একমাত্র সরকারের। পেলে পেলো না পেলে নাই। মিডিয়া জানলে অল্প হৈ চৈ তারপর সব শুনশান। কিন্তু এর বাইরে যদি কাউকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় অথবা মুক্তিপণ জাতীয় ব্যাপার থাকে তখন তা আর নীরব বা গোপন কোন ঘটনা নয়। পুলিশ আইন সমাজ মিডিয়া মিলে ধুন্দুমার কাণ্ড। খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি রনই কারোর। কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র অদ্ভূত। কে হারালো কে আসলো সেটা নিয়ে ক’দিন হৈ চৈ বা শোরগোল থাকলেও একসময় সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। নিখোঁজের আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধবরা ছাড়া কারো মনেও পড়ে না। বর্তমানে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুমের নাটক। যে যায় সে যায় আমি শুধু চোখ তুলে দেখি তার যাওয়া, জাতীয়  গুমের বড় উদাহরণ ও প্রতীক ইলিয়াস আলী। কোন দলের বা কী কারণে তিনি অদৃশ্য হলেন তার চেয়ে ও বড় কথা আশ্চর্যজনকভাবে আজ অবধি তিনি গায়েব হয়ে রইলেন। সাধারণত দেশের নামী দামী রাজনীতিবিদ বা দলগুলো জড়িত থাকলে গুম হওয়া মানুষ বাংলা সিনেমার স্টাইলে ফিরে আসে। আমাদের কৈশোরে দেখা সিনেমাগুলোতে কালো আলখেল্লা পরা যাদুকর বা ফকির বাবার কেরামতি ছিল দেখার মত। শূন্যে লাঠি ছুঁড়ে  “হক মাওলা” জাতীয় ডাক পড়লেই আসামি বা বান্দা হাজির। সারা হলময় তখন হাততালি আর উল্লাসের শিষ।  কিন্তু ইলিয়াসের বেলায় সেটা ঘটল না। দু’দুজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলেন বিদায় নিলেন বড় বড় কথা বললেন, প্রতিশ্রুতি দিলেন কিছুতেই কিছু হল না। সাহারা খাতুন যে পারবেন না সেটা তার চেহারা দেখেই বোঝা যেত। পরের জনও পারেননি। এখন যিনি আছেন ইলিয়াসের দায় দায়িত্ব বোধহয় তার নয়। ক’দিন পর বলবেন আমার আমলে যখন হয়নি আমি কীভাবে দায়িত্ব নেব? ঠিকই তো যে দেশে মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামে হাজার হাজর মানুষ গুম হলেও কেউ দায়িত্ব নেয়নি সেদেশে ইলিয়াস কেডা?
যে কথা বলছিলাম আমাদের সিনেমা মার খাওয়ার আরেকটা কারণ হল- আমাদের সিনেমায় এখন নতুন কোন ক্লাইমেক্স নেই। এই যে  গুম হওয়া এ বি সিদ্দিকের ফিরে আসা এমন কোন চিত্রনাট্য কি কেউ লিখতে পারবেন? কোন কারণ ছাড়া কি কাউকে গুম বা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়? যদি তাই হয় তবে কী কারণে তাঁকে তিনশ’ টাকা পকেটে গুঁজে ফেরত পাঠানো হল? মিডিয়া  প্রচার ও ইমেজ নষ্ট হবার ভয়ে? ইলিয়াস আলীর বেলায় তো এর হাজার গুন বেশী হৈ চৈ হয়েছে। ইলিয়াসকে যারা গুম করেছে তারা কি তবে মিডিয়া বা আইনের ঊর্ধ্বে? না এ বি সিদ্দিকী সব কিছুর চেয়ে পাওয়ারফুল?
ঘটনা ঘটার পর খুব বেশী সময় সবুর করতে হয়নি। মীরপুরের রাস্তায় নিজেই রিকশা অটো চড়ে ফিরে এসেছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাবর্তনে আমরাও স্বস্তি পেলাম। যাক যা কিছু হারায় তাহা আবার ফেরতও আসে তা হলে.. কিন্তু এর তো একটা ন্যায্য ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। বেলার নির্বাহী পরিচালকের জামাই বলে না অন্য কোন কারণে অপহরণের এই খেলা? যারা তাকে ফেরত দিলো তাদের কি ভয় ডর নাই? তিনি তো সব জানেন। তিনি যদি বলে দেন তাহলে কি হবে? এ চিন্তা মাথায় ছিল না তাদের? না তারা নিশ্চিত যে সিদ্দিক সাহেব মুখ খুলবেন না? কেন তিনি মুখ খুলবেন না? সেটা তো রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি তাঁর আস্থাহীনতার প্রমাণ হবে। যে রাষ্ট্র ও পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না তার কাছে সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপদ থাকবে কীভাবে? ফলে সত্য উদঘাটিত হতেই হবে। আর যদি না হয় তা হলে সন্দেহের তীর থেকে কাউকে ছাড় দেয়া যায় না।
বিচিত্র দেশ ও সমাজের মানুষেরা আসলে ভয়াবহ এক বাস্তবতার ভেতর বসবাস করছেন। যিনি গুম হলেন তিনি বা তাঁর আত্মীয়দের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে যে হৈ চৈ তাতে মনে হল এতদিন কেউ কিছু জানতোই না। এতদিন ধরে বেলা ও তার মালিকের ভূমিকা নিয়ে নিশ্চুপ মানুষরা হঠাৎ সরব হয়ে উঠলেন। এটা যেমন বিস্ময়ের তেমনি অবাক হলাম তাঁর দ্রুত প্রত্যাবর্তনে। আমরা তো চাই যে কেউ কোন দিনও গুম না হোক আর যদি এমন কাণ্ড ঘটেও মুহূর্তে তার প্রতিবিধান করা হোক। কিন্তু এ নাটক তো আরো শক্তিশালী। এটা কি রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ না সমাজের ভেঙ্গে পড়ার আরেকটি জ্বলন্ত প্রমাণ? যেটাই হোক সরকারের দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। কারণ সব কিছু নিয়ে রাজনীতি বা রাখ ঢাক  চলে না। সেটা মানুষ ভালোভাবে নেয়ও না। বর্তমান সরকারের আমলে এই জাতীয় ঘটনা ঘটে চলেছে এবং তার কোন কূল কিনারাও হয়নি। এবারও যদি না হয় বুঝতে হবে আমাদের দেশের মানুষের জীবন আসলেই অনিরাপদ।
বাংলা সিনেমার ঘোর দুর্দিন আদৌ কাটবে বলেও মনে হচ্ছে না। কারণ নাটক যখন জমে ওঠে মানুষ দেখে হাততালি দেয় কাঁদে  ভয় পায় আনন্দ বেদনায় একাত্ম হয়ে পড়ে। আর নাটকের নির্মাতারা তা উপভোগ করেন আর সিরিয়ালের মত টেনে টেনে তা লম্বা করতে ভালোবাসেন। এভাবেই কি চলবে দেশ?

Share on Facebook
সম্পাদক মন্ডলীর চেয়ারম্যান ॥ মোঃ দেলোয়ার হুসেন শরীফ, সম্পাদক ॥ আনোয়ার হোসেন
উপজেলা মোড়, টেনিস কোর্ট রোড, ৫৯ মাষ্টার বাড়ি, ঢাকা।
সংবাদঃ ০১৭১১৩২৪৬৬০ বিজ্ঞাপনঃ ০১৯১১২৪৫৬১৬
ই-মেইল ॥ news@playingnews.com
খেলা পাগল মানুষদের কথা চিন্তা করেই দেশী-বিদেশী সকল ...
খেলাধূলার খবর